গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে

 


কিছুদিন আগে প্রগতির যাত্রী নামক অনলাইন পত্রিকায় “মঙ্গলে সামার ভ্যাকেশন” নামে  আমার একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। চেষ্টা করেছি যতদূর সম্ভব সহজ করে লেখার আর ইচ্ছে করেই কিছু কিছু সমীকরণ সেখানে দিয়েছিলাম। ধারণা ছিল ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের এসব ফর্মুলা কারো  ন্যই কোন সমস্যার সৃষ্টি করবে না। কিন্তু পরবর্তীতে অনেকের সাথে কথা বলে বুঝলাম ব্যাপারটা তত সহজ নয়। ইতিমধ্যেই অনেকেই অনেক কিছু ভুলে গেছেন। শিক্ষার মূল কথাই যেহেতু  পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া, তাই তাই কোন কিছু আত্মস্থ করার চেয়ে মুখস্ত করার দিকেই আমাদের নজর বেশি। ফলে না ভোলাটাই অস্বাভাবিক।

ঐ লেখাটায় আমি চেষ্টা করেছিলাম মানুষের মহাকাশ জয় নিয়ে কিছু কথা বলতে। ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল ইউরি গাগারিনের মহাকাশ জয়ের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ঢাকার সোভিয়েত ইউনিয়নের আলুম্নাইদের উদ্যোগে একটা অনলাইন সেমিনারের আয়োজন করা হয় যেখানে এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ ও লেখক দীপেন ভট্টাচার্য। সেখানে অনেক শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া শুনে বুঝেছিলাম অনেক কিছুই তাদের কাছে স্পষ্ট নয় আর সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই আমার মঙ্গল যাত্রা। কিন্তু সেই লেখার প্রতিক্রিয়ায় মনে হল সেই যাত্রার আগে একটা ছোটখাটো প্রস্তুতি দরকার। আর সেই উদ্দেশ্য থেকেই এই লেখার
অবতারণা। সেদিক থেকে এই লেখা মূলত “মঙ্গলে সামার ভ্যাকেশন” পরিবর্ধিত রূপ। ওই লেখার সবতাই এখানে থাকবে আর সেই সাথে কিছু কিছু সমীকরণের উপর আলোচনা। সেটাকে ব্যাখ্যা না বলে দৈনন্দিন জীবন থেকে  উদাহরণ দিয়ে পদার্থবিদ্যার সূত্র বোঝানোর প্রয়াস। জানি না এটা অন্যের জন্য কতটুকু উপকারে আসবে, কিন্তু লিখতে গিয়ে নিজে যেহেতু বিভিন্ন ভাবে এসব নিয়ে ভেবেছি – এটা আমার কাজে লাগবে।     

যেহেতু মহাশূন্য ভ্রমণে রকেট চলে নিউটনের সূত্রের উপর ভিত্তি করে তাই আমাদের খুব ভাল
ভাবে বোঝা দরকার নিউটনের সূত্রাবলী। আমরা শুরু করব সেখান থেকেই। মূলত চেষ্টা করব দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব সূত্র বোঝাতে।   
নিউটনের প্রথম সূত্র অনুযায়ী “কোন বস্তুর উপর বাহ্যিক বল প্রয়োগ না
করলে বস্তুটি হয় স্থির থাকবে নয় তো সমবেগে সরল পথে চলতে থাকবে।”

এটা আমাদের অনেকেরই মুখস্ত আছে। এখন চেষ্টা করা যায় সেটাকে ভিজুয়ালাইজ করার, মানে দৈনন্দিন জীবনের উদাহরণে সেটা বোঝার।   

ধরুন টেবিলের উপর একটা বই বা আপেল আছে। যদি সেটাকে ধাক্কা না দেওয়া হয় বা টানা না হয়, মানে তার উপর বাহ্যিক বল প্রয়োগ করা না হয় তাহলে সেটা ওখানে স্থির থাকবে, তার অবস্থানের কোন পরিবর্তন হবে না। এটা আমরা সবাই জানি বা এই মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। কিন্তু সমবেগে সরল পথে চলবে সেটা বোঝা কি এতই সহজ? যদি বল প্রয়োগ না করা হয় তার গতিই বা আসবে কোত্থেকে? দেখা যাক আমরা দৈনন্দিন জীবনে এমন কোন উদাহরণ পাই কিনা। পদার্থবিদ্যার সূত্রগুলো আবিষ্কারের জন্য আমরা রিয়ালিস্টিক মডেলের পরিবর্তে প্রায়ই আদর্শ মডেল ব্যাবহার করি। আমরা সেটাই এখানে করব। সেটা ব্যবহার করেই চেষ্টা করব সমবেগে সরল পথে চলার উদাহরণ দিতে। প্রথমে আমরা কল্পনা করতে পারি নিস্তরঙ্গ নদীর কথা। সেখানে স্রোত এমনভাবে বইতে থাকে যে অনেক সময় নদীতে না নেমে সেটা টেরই পাওয়া যায় না। ওখানে যদি একটা কাগজের নৌকা ভাসিয়ে দেওয়া হয় তখন আমরা বুঝি নদীতে স্রোত আছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে সেটা সমবেগে সরল পথে চলছে। দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ট্রেনের কথা। ট্রেন যখন চলতে শুরু করে আমরা নিজেদের শরীরে সেটা অনুভব করি। একসময় আমরা আর তার গতি অনুভব করি না। মানে ট্রেন খন সমবেগে সরল পথে চলতে শুরু করেছে। তখন এটাও সেই কাগজের নৌকার মত। কিন্তু যখনই সে মোড় নেয়, আমাদের শরীর অন্যদিকে ঢলে পড়ে। এই ঢলে পড়া মানেই এক নতুন বলের উপস্থিতি যা তাকে আর সরল পথে চলতে দিচ্ছে না। এরকম ভাবেই আমরা বলতে পারি বিমান ভ্রমনের কথা। টেক অফ করার পরে বিমান যখন অনেক উঁচুতে উঠে যায় তখন এক সময় আমরা চলছি কিনা সেটা অনুভব করতে পারি না। এর অর্থ হচ্ছে বিমান তখন সমবেগে সরল পথে চলছে। কিন্তু যখনই মেঘ বা অন্য কোন কারণে বিমান দিক পরিবর্তন করে অথবা তার গতিবেগ কমায় বা বাড়ায় আমরা সেটা সমস্ত শরীর দিয়েই অনুভব করি।  খেয়াল করলে দেখব, ট্রেন বা প্লেন যখন দিক পরিবর্তন করে আমরা তার উল্টো দিকে হেলে পড়ি। এর মানে হল সরল পথে না চলা মানে বাহ্যিক বলের উপস্থিতি। নিয়ে আমরা পরে আবার বলব।  উল্লেখ করা যেতে পারে যে নিউটনের প্রথম সূত্র আপেক্ষিক তত্ত্বের বিশেষ সূত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। 


 

স্যার আইজ্যাক নিউটন (১৬৪৩ ১৭২৭) – ব্রিটিশ পদার্থবিদ ও গণিতবিদ। লেইবনিৎসের সাথে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেন। আধুনিক গতিবিদ্যার জনক। (ফটো – ইন্টারনেট)

  

এবার আসা যাক নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রে।

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র থেকে আমরা জানি যে কোন বস্তুর ত্বরণ তা উপর প্রযুক্ত বলের আনুপাতিক আর তার ভরের ব্যাস্তানুপাতিকঃ

 

এটা প্রমাণের জন্য আমরা কোন একটা স্থির বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করে দেখতে পারি। স্থির বস্তু মানে এর বেগ শূন্য। আপনি যদি সেই বস্তুকে ধাক্কা দেন, তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে সেই বস্তুর উপর আপনি বাহ্যিক বল প্রয়োগ করছেন। খেয়াল করলে দেখবে, আপনার ধাক্কার জোরের উপর নির্ভর করবে বস্তুটি কত কত দ্রুত সরে যাচ্ছে। এখানে এসব বলছি জাস্ট আইডিয়া দেওয়ার জন্য কীভাবে এসব সূত্রগুলো অন্তত গুনগত ভাবে আমরা ঘরে বসেও প্রমাণ করতে পারি। যত জোরে ধাক্কা দেবেন তত বেশি বল প্রয়োগ করবেন আর তত দ্রুত বস্তুটি চলতে থাকবে। যেহেতু বস্তুর আদি বেগ ছিল শূন্য, ধাক্কা খেয়ে সে বেগ প্রাপ্ত হল, তার মানে তার  মধ্যে ত্বরণ সঞ্চারিত হল। ত্বরণ হল বস্তর বেগের পরিবর্তনের হার। অতএব আমরা দেখছি বস্তুর ত্বরণ তার উপর প্রযুক্ত বলে সমানুপাতিক। অন্যদিকে আপনি যদি একই বলে দুটো ভিন্ন ভরের বস্তুকে ধাক্কা দেন, দেখবেন  অপেক্ষাকৃত হালকা বস্তু অপেক্ষাকৃত দ্রুত চলছে। তার মানে বলের পরিমাণ ভরের সমানুপাতিক বা বস্তুর ত্বরণ ভরের ব্যাস্তানুপাতিক 

অন্যদিকে নিউটনের মহাকর্ষ বলের সূত্র থেকে আমরা জানি যেকোনো দুটো বস্তু পরস্পরকে যে বলে আকর্ষণ করে তা তাদের প্রত্যেকের ভরের সমানুপাতিক ও তাদের মধ্যকার দুরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিকঃ 


এ থেকে আমরা দেখি দুটো বস্তর ভর যত বেশি তাদের মধ্যে আকর্ষণ বলও তত বেশি আর তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব যত বেশি তাদের মধ্যকার আকর্ষণ বল তত কম। তবে
এই সূত্রের প্রমাণ আমরা তত সহজে পেতে পারি না যেটা পেয়েছি নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের ক্ষেত্রে। প্রশ্ন জাগতে পারে বিভিন্ন বস্তু নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে মাটিতে ফেলে একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় যে, যে বস্তু যত ভারি সেই বস্তু তত জোরে বা তত বেশি বলে মাটিতে আঘাত করে। এটা আমরা নীচে কোন ওয়েট মেশিন রেখে দেখতে পারি। থেকে মনে হতে পারে যে ভারী বস্তুগুলো পরস্পরকে বেশি বলে আকর্ষণ করছে, মানে আকর্ষণ বল ভরের সমানুপাতিক। আবার একই সাথে আমরা দেখব একই বস্তু যত উপর থেকে মাটিতে পড়বে সে তত জোরে মাটিতে আঘাত করবে। যদিও ফর্মুলা অনুযায়ী এর বল উল্টো হবার কথা ছিল। তাহলে? সব বস্তু স্থিরাবস্থা থেকে পড়তে শুরু করে। এখানে যেসব পর্যবেক্ষণের কথা বলা হচ্ছে সেক্ষত্রে সব বস্তুরই আদি বেগ বা পড়তে শুরু করার মুহূর্তে বেগ থাকে শূন্য। সেটা হয় আমরা বস্তু ছেঁড়ে দিই অথবা অংকের মত উপরে ঢিল ছুঁড়ি। উভয় ক্ষেত্রেই আমরা দেখি নীচের দিকে পড়তে শুরু করার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তার বেগ শূন্য। যেহেতু সব বস্তুই সমত্বরণে পড়তে থাকে তাই যে বস্তু যত বেশি উপর থেকে পড়ে মানে যত বেশি পথ পাড়ি দেয় সে তত বেশি সময় ধরে চলে আর এই সময়ে সে তত বেশি গতিশক্তি অর্জন করে। তার মানে এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা নিউটনের মহাকর্ষ বলের সূত্র প্রমাণ করতে পারছি না। এর অন্য একটা কারণ হল আমরা যেসব বস্তর কথা বলছি, সেটা ইট, পাথর যাই হোক না কেন সবই পৃথিবীর অংশ। আমরা শুধু মাত্র ভূপৃষ্ঠ থেকে কিছুটা উপরে তুলেই তাকে পৃথিবী থেকে আলাদা হিসেবে বর্ণনা করতে পারি না। আবার তার মানে এই নয় যে নিউটনের সূত্র ঠিক নয়। বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এই সূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রশ্ন জাগতে পারে যদি সব বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে তাহলে কেন ভারী বস্তু হালকা বস্তুকে নিজের বলয়ে এনে তার অধিগ্রহণ করে না? এর কারণ মহাবিশ্বে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি বস্তুই নিজের অক্ষের চারিদিকে ঘুরে আর দুটি বস্তু তাদের ভরকেন্দ্রের চারিদিকে ঘুরে। এর ফলে বস্তর মধ্যে কেন্দ্রমুখী ও কেন্দ্রবিমুখী বলের সৃষ্টি হয়। এই বলই এক ধরণের স্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। এ কারণের কৃত্রিম উপগ্রহ যাতে পড়ে না যায় তাকে অনবরত পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে হয়। যতক্ষণ এই কেন্দ্রমুখী আর কেন্দ্রবিমুখী বল পরস্পরের সমান হয় ততক্ষণ আবর্তনের কক্ষপথ স্থিতিশীল হয়। কোন বলের পরিমাণ বেড়ে গেলে অপেক্ষাকৃত হালকা বস্তু হয় কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হয় অথবা কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায়। এখানে বলা দরকার যে দুটো বস্তর ভরকেন্দ্র যে বস্তু বেশি ভারী তার তত কাছে থাকে। এখান থেকে দেখা যায় যদি দুটো বস্তর ভর সমান হয় তাদের ভরকেন্দ্র দুটো বস্তুর কেন্দ্রকে যদি কাল্পনিক সরল রেখা দিয়ে যোগ করা হয় তবে সেই রেখার ঠিক মাঝখানে থাকবে। এখানে আমরা পাঞ্জা লড়াইএর কথা ভাবতে পারি। লড়াইয়ের শুরুতে কেউ কারও উপর বল প্রয়োগ করে না, তাই কিছুই ঘটে না। পরবর্তীতে দু জন একে অন্যের বিপরীতে বল করতে শুরু করে। যতক্ষণ পর্যন্ত দু দিক থেকে প্রযুক্ত বলের যোগফল  শূন্য হয়, মানে দুজনেই সমান বলে একে অন্যকে ধাক্কাতে শুরু করে অর্থাৎ একজন অন্য জনের উপর প্রযুক্ত বল কম্পেনসেট করে ততক্ষন দুজনের হাত আগের জায়গায় থাকে। কিন্তু যে মুহূর্তে একজনের বল অন্যের চেয়ে বেশি হয় তখন সে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে।    

এখন কোন বস্তু যদি পৃথিবীর আকর্ষণের কারণে ত্বরণায়িত হয় তবে উপরের দুটো ফর্মুলা থেকে আমরা দেখি মাধ্যাকর্ষণ জনিত ত্বরণ  

 



উপরের সমীকরণ থেকে আমরা দেখতে পাই যে, কোন বস্তুর (যেমন পৃথিবীর) মাধ্যাকর্ষণ জনিত ত্বরণ সে যেসব বস্তুকে আকর্ষণ করছে তাদের ভরের উপর নির্ভর করে না, অর্থাৎ বিভিন্ন ভরের কাধিক বস্তু স্থির অবস্থা থেকে শুধু মাধ্যাকর্ষণ বলের টানে পড়তে শুরু করে তাদের ত্বরণ একই হবে। তবে মনে রাখতে হবে সেটা হতে হবে মুক্ত পতন বা ফ্রি ফল। অর্থাৎ বাতাস বা অন্য কোন বল যেমন বস্তুর পতনে বাধা দিতে পারবে না, তেমনি কোন বল বস্তুর পড়ার গতির উপরও প্রভাব ফেলতে পারবে না। এটাকে বলা হয় মুক্ত পতনের সূত্র। গ্যালিলিও পিসার হেলানো গির্জা থেকে বিভিন্ন ভরের বস্তু মাটিতে ফেলে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই সূত্র আবিষ্কার করেন বলে কথিত আছে। ল্যাবরেটরিতে বায়ুশূন্য নলে বা টিউবে কয়েন, পালক ইত্যাদি রেখে এই সূত্রের সত্যতা প্রমাণ করা হয়। উপরের সমীকরণ (৩) থেকে আরও একটা জিনিস আমরা পাই যা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের সাথে জড়িত। এখানে আমরা দেখছি কোন বস্তুর অন্য বস্তুকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা সেই বস্তুর ভরের সমানুপাতিক। যেহেতু তুলনামূলক কম বেগে চলমান বা স্থির বস্তুর ভর অপরিবর্তনীয় তাই পৃথিবী ও চন্দ্র পৃষ্ঠে একই বস্তুর ওজন হবে বিভিন্ন। চন্দ্রপৃষ্ঠে সেটা পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৬ গুণ কম ফলে মানুষ সেখানে লাফিয়ে অনেক উপরে উঠতে পারবে। তার প্রমাণ আমরা পাই যেসব নভোচারী চন্দ্র বিজয় করেছেন তাদের ভিডিও দেখে। এটাও নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের সত্যতা প্রমাণ করে।  


নিউটনের তৃতীয় সূত্র বলে যে প্রতিটি বলের সমান বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। সেটার প্রমাণও আমরা নিজেরাই করতে পারি। যদি দেওয়ালে ধাক্কা মারেন দেখতে পাবেন আপনি যত জোরে দেওয়ালটাকে ধাক্কা দিচ্ছেন, ঠিক তত জোরেই দেয়াল আপনাকে উল্টো দিকে ঠেলছে। অথবা আপ্পনি যত জোরে একটি বল মাটিতে ছুঁড়ছেন সেটা তত জোরে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

এখন কোন বস্তু যদি পৃথিবীপৃষ্ঠের খুব কাছে ঘুরতে শুরু করে, অর্থাৎ পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে তার দূরত্ব
 পৃথিবীর ব্যাসার্ধ এর তুলনায় নগণ্য হয়, তবে সেই বস্তুর গতিপথ বৃত্তাকার বলে ধরে নিতে পারি। এখন বস্তু আর সরল পথে চলছে না। এক্ষেত্রে এমনকি বস্তু যদি সমগতিতেও চলে তার উপর বাহ্যিক বল শূন্য হবে না। বস্তুর উপর কেন্দ্রমুখী ও কেন্দ্রবিমুখী বল কাজ করবে। বৃত্তাকার পথে ঘুরন্ত কোন বস্তু যদি T সময়ে কেন্দ্রের চতুর্দিকে একবার ঘুরে আসে, মানে চার সমকোণ অতিক্রম করে তবে তার কৌণিক বেগ 


 

আর যেহেতু এই সময় সে বৃত্তের পরিসীমার সমান পথ পাড়ি দেয় তাই তার রৈখিক বেগ


আর বৃত্তাকার পথে ঘূর্ণিয়মাণ বস্তুর ত্বরণ



নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রে মহাকর্ষীয় বল (২) ও ত্বরণ (৬) ব্যবহার করলে আমরা পাই



উপরের সমীকরনের মাধ্যমে প্রাপ্ত বেগকে বলে প্রথম এস্কেপ ভেলোসিটি। পৃথিবীর জন্য এর মা ৭.৯১ কিমি/সেকেণ্ড। এই বেগে চলে বস্তু পৃথিবীর কৃত্রিম উপগ্রহে পরিণত হয় এবং পৃথিবীর চারিদিকে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে।
দ্বিতীয় এস্কেপ ভেলোসিটিতে চলে বস্তু পৃথিবীর আকর্ষণ বলকে অতিক্রম করতে পারে। সেক্ষেত্রে বস্তু উপবৃত্ত পথে চলে। ফলে সেই বস্তুর পৃথিবী থেকে অসীম দূরত্বে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। দ্বিতীয় এস্কেপ ভেলোসিটি আমরা এর পূর্ণ শক্তি থেকে পেতে পারি।

আমরা জানি কোন বস্তুর পূর্ণ শক্তি (total energy) তার গতি শক্তি ও স্থিতি শক্তির সমষ্টির সমান

 


 

এখানে প্রথম টার্ম রকেটের গতি শক্তি আর দ্বিতীয় টার্ম পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তি বা পটেনশিয়াল ফিল্ড। যদি পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তি রকেটের গতি শক্তির চেয়ে বেশি হয় তবে রকেট পৃথিবীর আকর্ষণ কাটিয়ে বাইরে যেতে পারে না। যদি গতি শক্তি পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তির সমান হয় তবে পূর্ণ শক্তির পরিমাণ হবে শূন্য। এক্ষেত্রে (৮) নং সমীকরণ থেকে রকেটের ন্যুনতম বেগ পাব 


 
এটাই হল দ্বিতীয় এস্কেপ ভেলোসিটিপৃথিবীর ক্ষেত্রে এই বেগের মাণ ১১. কিমি/সেকেণ্ড। এই বেগে ধাবমান বস্তু পৃথিবীর আকর্ষণ কাটিয়ে চাঁদ বা সৌর জগতের অন্যান্য গ্রহে পাড়ি দিতে পারে। সেদিক থেকে চাঁদে যাওয়া আর মঙ্গল, শুক্র, বৃহস্পতি, শনি বা অন্য গ্রহে যাওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস বা নেপচুনের ভর পৃথিবীর চেয়ে অনেক বেশি বিধায় সেসব গ্রহের দ্বিতীয় এস্কেপ ভেলোসিটি পৃথিবীর তুলনায় বেশি (যথাক্রমে ৫৯.৫, ৩৫.৫, ২১.৩ ও ২৩.৫ কিমি/সেকেণ্ড) ফলে সেসব গ্রহ থেকে ফিরে আসা সম্ভব হবে না। তবে চাঁদ, বুধ, শুক্র বা মঙ্গল, যাদের ভর পৃথিবীর ভরের চেয়ে কম, সেসব উপগ্রহ ও গ্রহের দ্বিতীয় এস্কেপ ভেলোসিটি পৃথিবীর তুলনায় কম (যথাক্রমে ২.৪, ৪.৩, ১০.৪ ও ৫ কিমি/সেকেণ্ড) তাই এসব উপগ্রহ বা গ্রহ থেকে সে অনায়াসেই ফিরে আসতে পারে অর্থাৎ পৃথিবীর চেয়ে ভারী গ্রহের টিকেট যদি ওয়ান হয়ে হয়, হালকা গ্রহ উপগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা আপ ডাউন টিকেট হাতে নিয়েই সেখানে যেতে পারি। পৃথিবীতে কোন বস্তুর বেগ যদি ১৬. কিমি/সেকেণ্ড হয় তবে সে সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ কাটিয়ে সৌরজগতের বাইরে চলে যেতে পারে। একে বলে তৃতীয় এস্কেপ ভেলোসিটি। এটার কক্ষপথও উপবৃত্তাকার। উল্লেখ্য, সৌরজগতের ভরের প্রায় ৯৯.%  সূর্যের ভর। তাই সৌরজগতের আকর্ষণ  মূলত সূর্যের আকর্ষণ। উল্লেখ করা যেতে পারে যে সূর্যের দ্বিতীয় এস্কেপ ভেলোসিটি ৬১৮.১ কিমি/সেকেণ্ড, তাই সৌরজগত ত্যাগের জন্য বস্তুর তৃতীয় এস্কেপ ভেলোসিটি নির্ভর করবে সে ঠিক কোন জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করেছে। তাছাড়া চতুর্থ এস্কেপ ভেলোসিটি নামে আরেকটা বেগ আছে যা কিনা বস্তুকে আমাদের  গ্যালাক্সি ত্যাগ করতে দেয়।  সেটার মাণ হল ৫৫০ কিমি/সেকেণ্ড। যেহেতু এসব বেগই আলোর বেগের তুলনায় নগণ্য, তাই সব ক্ষেত্রেই নিউটনের সূত্রই প্রযোজ্য।

(২) নং সমীকরণ থেকে আমরা দেখি বস্তুর ভর যত বেশি তার প্রতি আকর্ষণ বল তত বেশি আর এই আকর্ষণ কাটিয়ে উঠতে বেশি শক্তি বা জ্বালানি দরকার।  যার ফলে দেখা যায় কোন কৃত্রিম উপগ্রহ মহাশূন্যে পাঠাতে পৃথিবী থেকে যে মহাশূন্য যান রওনা হয় তার বেশির ভাগই এই জ্বালানি। এই জ্বালানির বেশির ভাগই খরচ হয় পৃথিবীপৃষ্ঠ ত্যাগ করার সময়। রকেটে না চড়েও এ ব্যাপারটা আমরা  বুঝতে পারি বিমান যাত্রার সময়, যখন মূল শক্তিটা লাগে টেক অফের সময় আর তারপর বিমানের গতি হয় অনেক স্মুথ। যেহেতু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলয় থেকে বের হয়ে গেলে মহাকাশ যান বলতে গেলে মাধ্যাকর্ষণ, বায়ুর বাধা ইত্যাদি কোন রকম প্রতিদ্বন্দ্বী বলের সম্মুখীন হয়না, ফলে তুলনামুলক ভাবে কম জ্বালানি ব্যবহার করেই সে চলতে পারে আর এক্ষেত্রে কাজ করে নিউটনের তৃতীয় সূত্র, অর্থাৎ রকেট জ্বালানি পোড়ার ফলে যে শক্তি ধোঁয়ার আকারে বেরিয়ে যায় সেটাই মহাকাশ যানকে সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। তবে নিউটনের সূত্র ব্যবহার করে মহাকাশে শুধু মহকাশ যানই পাঠানো যায়। মহাকাশ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানার জন্য আমাদের বিভিন্ন রকমের আধুনিক ডিভাইস দরকার যা কিনা কোয়ান্টাম তত্ত্বকে ব্যবহার করেই তৈরি করা সম্ভব।

আমার এ লেখা এখানেই শেষ করা যেত। তবে যেহেতু লেখার শুরুতেই বলেছি ইউরি গাগারিনের মহাশূন্য বিজয়ের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত সেমিনার থেকেই এই লেখার সূত্রপাত, তাই এ বিষয়ে দুকথা বলাটাই শ্রেয়। যদিও দেশে ইংরেজি অনুসরণে গ্যাগারিন বানানটাই প্রচলিত, আমি এখানে রুশ উচ্চারণ অনুসরণ করে গাগারিন লেখাটাই সঠিক মনে করি।

গত ১২ এপ্রিল মানব জাতি পালন করল ইউরি গাগারিনের মহাকাশ বিজয়ের ৬০ বছর। ১৯৬১ সালের এই দিনে সোভিয়েত কসমানাভত বা নভোচারী ইউরি আলেক্সেয়েভিচ গ্যাগারিন সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে ১০৮ মিনিটের এক সংক্ষিপ্ত সফরে মহাকাশ যাত্রা করেন। মাত্র ১০৮ মিনিটের এই মহাকাশ ভ্রমণ পালটে দেয় মানব জাতির ইতিহাস – শুরু হয় নতুন যুগের।

এরপর আসে চন্দ্র বিজয়ের পালা। স্পুটনিক নিক্ষেপ ও মহাকাশে প্রথম মানব পাঠানোর দৌড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন জয়লাভ করলেও চাঁদের দেশে প্রথম অবতরণ করেন আমেরিকার নভোচারীদ্বয়। এর পরেও বেশ কয়েকটি মিশন পাঠানো হয় চাঁদে। তবে এক সময় চাঁদ বা অন্যান্য গ্রহের প্রতি মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়ে। মানুষ এবার নজর দেয় দূর আকাশের দিকে। চন্দ্র, প্ল্যাঙ্ক ইত্যাদি টেলিস্কোপের সাহায্যে সংগ্রহ করতে থাকে দূর আকাশ থেকে আগত বিভিন্ন সিগন্যাল। বিশেষ করে মহাবিশ্বের ত্বরণায়িত প্রসারণ আবিষ্কারের পরে তার দৃষ্টি চলে যায় অন্য দিকে। তবে ইদানীং কালে সে আবার ফিরে আসছে চাঁদ আর মঙ্গলের কাছে। বিভিন্ন দেশ অদূর ভবিষ্যতে চাঁদ আর মঙ্গলে মিশন পাঠানোর কথা ঘোষণা করেছে। তাই ইউরি গাগারিনের মহাকাশ বিজয় আবার নতুন আঙ্গিক পেয়েছে।




 

ইউরি আলেক্সেয়েভিচ গাগারিন
(১৮৩৪ ১৯৬৮) মহাকাশ বিজয়ী সোভিয়েত নভোচারী। (ফটো ইন্টারনেট)   

মহাকাশ যাত্রার কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে কথাটা মাথায় আসে সেটা হল রকেট টেকনোলোজি। মানুষ বরাবরই আকাশ জয় করতে চেয়েছে। তাই সেই গ্রীক আখ্যানে আমরা পাই ইকারকে যে মম দিয়ে পাখির পালক জুড়ে নিজের জন্য পাখা তৈরি করে উড়তে চেয়েছিল। আধুনিক কালে জুল ভার্ণ আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখেছেন আর রাইট ভ্রাতৃদ্বয় সেটাকে বাস্তবায়িত করেছেন। কিন্তু সেটা মহাকাশ বিজয় ছিল না। কিন্তু উড়োজাহাজের আবিষ্কার মানুষকে কানে কানে বলে দেয় যে মহাকাশ জয় এখন সময়ের ব্যাপার।

যে মানুষটি শুধু কল্পনায় নয়, মহাকাশ বিজয় যে এক বৈজ্ঞানিক সত্য হতে পারে সেটা বিশ্বাস করেছিলেন তাঁর নাম কনস্তান্তিন এদুয়ারদোভিচ ৎসিয়োলকোভস্কি। রুশ সোভিয়েত এই কল্পবিলাসী মানুষের জন্ম জারের রাশিয়ার রিজান গুবেনিয়ার ইঝেভ শহরে ১৮৫৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। এই স্বশিক্ষিত বিজ্ঞানী আবিষ্কারক পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষক। তাঁকে বলা যায় তত্ত্বীয় মহাকাশ ভ্রমণ বিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি রকেটের সাহায্যে মহাকাশ ভ্রমণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেন। অ্যারোনটিকস, রকেট গতিবিদ্যা মহাকাশ ভ্রমণ বিদ্যার উপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পেপারের লেখক  কনস্তান্তিন এদুয়ারদোভিচ ৎসিয়োলকোভস্কি ১৯৩৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর  রুশ শহর কালুগায় মৃত্যু বরণ  করেন।


কনস্তান্তিন এদুয়ারদোভিচ ৎসিয়োলকোভস্কি (১৮৫৭ ১৯৩৫) রুশ সোভিয়েত বিজ্ঞানী আবিষ্কারক, তত্ত্বীয় মহাকাশ ভ্রমণ বিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা   (ফটো ইন্টারনেট)

 

মানুষ যখন মহাকাশে পাড়ি জমালো আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স - ফিজিক্সের এসব বিভাগ তখন খুব শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন আসতে পারে মহাকাশ বিজয়ের জন্য যে তাত্ত্বিক ভিত্তি দরকার সেটা কি বিজ্ঞানের এসব নতুন বিভাগের উপর নির্ভরশীল? উত্তর খুব সোজা। না, আমরা নিউটনের তত্ত্ব দিয়েই রকেট মহাকাশে পাঠাতে পারি, পাঠাই। মনে রাখতে হবে ছোটোখাটো অনেক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও নিউটনের তত্ত্ব দীর্ঘ দিন বস্তুর গতি নিখুঁত ভাবে বর্ণনা করেছে। কিন্তু মাক্সওয়েল যখন তাঁর ইলেক্ট্রোডাইনামিক্সের সমীকরণ প্রকাশ করেন দেখা গেল সেটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিউটনের তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। মাক্সওয়েলের তত্ত্বে বিভিন্ন কণার গতিবেগ আলোর গতির সমান বা কাছাকাছি বিধায় এই ধরণের সংঘর্ষ দেখা দেয়। এই দুই তত্ত্বকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে আপেক্ষিকতার বিশেষ সূত্র প্রকাশ করেন। দেখা যায় যে বস্তুর গতি যদি আলোর গতির তুলনায় নগণ্য হয়, সেক্ষেত্রে আইনস্টাইনের তত্ত্ব নিউটনের তত্ত্বে রূপান্তরিত হয়। আইনস্টাইনের নতুন তত্ত্বে স্থান-কাল নিউটনের তত্ত্বের মত আর পরম কিছু নয়, সেটা আপেক্ষিক। শুধু তাই নয় স্থান-কাল ও বস্তু পরস্পররের বিবর্তনকে প্রভাবিত করে। পরবর্তীতে দেখা যায় আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব নিউটনের গতিবিদ্যার তত্ত্ব ও মাক্সওয়েলের তত্ত্বের মধ্যেকার অসামঞ্জস্য দূর করলেও সেটা নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। আর এই অসামঞ্জস্য দূর করার জন্য ১৯১৭ সালে আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব প্রকাশ করেন।   

উপরে বর্ণিত ঘটনাবলী বোঝার জন্য এরকম একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যদিও সেটা ওয়ান টু ওয়ান অ্যানালগ নয় তবুও ঘটনাগুলো বুঝতে সহায়ক হবে। ছোটবেলায় আমরা সবাই ঘূর্ণিপাক খেয়েছি। খেলাটা হল দুজন দুজনের হাত ধরে  ঘুরতে থাকা। যদি দুজনের ভর একই হয় তবে এই ঘূর্ণনের কেন্দ্র হয় দুজনের ঠিক মাঝখানে। এই বিন্দুকে বলে ভরকেন্দ্র। যদি দুজনের ভর ভিন্ন হয় তবে ভরকেন্দ্র যে বেশি ভারী তার কাছাকাছি চলে আসে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পৃথিবী ও চাঁদের কথা। যদি এদের একটা অদৃশ্য রেখা দিয়ে যোগ করা হয় তবে ভরের তারতম্যের কারণে দেখা যায় এই ভরকেন্দ্র ভূপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ কিলোমিটার দূরে যদিও পৃথিবী এবং চাঁদের মধ্যেকার দূরত্ব ৩৮০০০ কিলোমিটার। তাই আমরা যখন বলি চাঁদ পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে সেটা ১০০% সঠিক নয়, তারা উভয়েই এই ভরকেন্দ্রের চারিদিকে ঘুরছে। ভরকেন্দ্র পৃথিবীর নিকটবর্তী বলে মনে হয় চাঁদই আসলে পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে। একই কথা বলা চলে সূর্যের চারিদিকে অন্যান্য গ্রহের ঘূর্ণনের ব্যাপারে। সৌর জগতের ৯৯.% ভর সূর্যের বিধায় আমাদের মনে হয় সব গ্রহই সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে, বাস্তবে যদিও সমস্ত গ্রহ এবং সূর্য নিজেও সৌর জগতের ভরকেন্দ্রের চারিদিকে ঘুরছে। যাহোক, ফিরে আসি আবার ছোট বেলায়। যে দুজন লোক একে অন্যের হাত ধরে ঘুরছে তাদের একজন যদি অন্যের তুলনায় যথেষ্ট ভারী হয় এবং ঘূর্ণনের বেগ একটা নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করে তবে অপেক্ষাকৃত হালকা জনের পা মাটি থেকে উঠে যায়, মনে হয় ভারী লোকটা যেন হালকা জনকে ঘোরাচ্ছে। কিন্তু এই বেগ বাড়তে বাড়তে যদি নতুন এক মাত্রা অতিক্রম করে তবে হাত ছুটে যায় আর হালকা লোকটা দূরে ছিটকে পড়ে। এখানে এই উদাহরণ দেবার উদ্দেশ্য একটাই – দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা দিয়ে পদার্থবিদ্যার সূত্র বোঝার চেষ্টা করা। এ থেকে আমরা দেখি বেগের তারতম্যের উপর নির্ভর করে একটা বস্তু পৃথিবীতে ফিরে আসবে নাকি পৃথিবীর চারিদিকে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকবে নাকি চিরতরে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে সুদূর মহাকাশের পথে পারি জমাবে।

  
দুবনা, ২
জুলাই ২০২১

 

 

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

মজার অংক, অংকের মজা

গবেষণা নিয়ে গবেষণা