মজার অংক, অংকের মজা

ছেলেমেয়েরা যখন স্কুলে যেতে শুরু করল, চেষ্টা করতাম বিশেষ করে অংক কষে ওরা যেন আনন্দ পায় আর সে জন্য ক্লাসের ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে এসব শেখানোর চেষ্টা করতাম। এতে অবশ্য হিতে বিপরীত হত। ওরা যেহেতু ক্লাসের বাইরে ছবি আঁকা, পিয়ানো, ভায়োলিন, নাচ, অরিগামী, সাঁতার, নৌকা চালানো, দেয়াল বেয়ে উপরে ওঠা এসব শিখত তাই আমার ডাকে সাড়া দেবার মত সময় ওদের ছিল না বললেই চলে। তারপরেও চেষ্টা করতাম ওদের এসব ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে। কেননা কোন কিছু কেউ যদি শুধু করার জন্য করে তাহলে সে কাজের আনন্দ যে কি সেটাই উপভোগ করতে পারে না। সে তখন জীবনটাকে দুই ভাগে ভাগ করে। একটা কাজ করে অর্থ আয় আর পরে সেই অর্থ ব্যয় করে দেশ ভ্রমণ বা অন্য কিছুর মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ করা। অথচ নিজের কাজকে উপভোগ করতে জানলে ব্যাপারটা একেবারেই অন্য রকম হয়ে দাঁড়ায়।

আজ কথা বলব বীজ গণিতের একটা সমস্যা নিয়ে যেটা সবার কাছেই অত্যন্ত পরিচিত। এটা দ্বিঘাত সমীকরণ। এটা বলার আরও একটা কারণ আছে। কয়েক বছর আগে ফেসবুকে ফ্যাক্টর পদ্ধতিতে এই সমীকরণের সমাধান খুব হই চই ফেলে দেয়। আমেরিকার কোন এক শিক্ষক এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন বলে দাবি করেন, অথচ ফ্রান্সুয়া ভিয়েট সেই ষোড়শ শতকেই এটা করেছিলেন।  


বীজ গণিতে প্রথমে কমবেশি সিরিয়াস যে সমস্যার সম্মুখীন আমরা হই সেটা দ্বিঘাত সমীকরণ। কেননা এর আগে পাটি গণিতে আমাদের এ ধরণের সমস্যা সমাধান করতে হয় না। তাই ভাবলাম এ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। প্রথমেই বলি এক্ষেত্রে আমাদের যে সমীকরণ সমাধান করতে হয় সেটা হল 


 

এখানে বাস্তব সংখ্যা। যেহেতু এটা দ্বিঘাত সমীকরণ তাই এর বড়জোর দুটো রুট বা মূল থাকবে, তবে সেটা নির্ভর করবে  a, b, c  এর মানের উপর। যদি জ্যামিতিক ভাবে দেখি তাহলে এই সমীকরণের সমাধান বলতে বোঝায় পরাবৃত্ত বা প্যারাবোলা


কোন কোন বিন্দুতে অক্ষ মানে y = 0 রেখাকে ছেদ করে অথবা আদৌ করে কি না সেটা বের করা। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে a ধনাত্মক না ঋণাত্মক তার উপর নির্ভর করে এই পরাবৃত্ত ঊর্ধ্বগামী না নিম্নগামী হবে। যদি a > 0 হয় তবে পরাবৃত্ত হবে ঊর্ধ্বগামী আর তার একটা সর্বনিম্ন মান বা মিনিমাম থাকবে (চিত্র ১), আর যদি a < 0 হয় তবে পরাবৃত্ত হবে নিম্নগামী আর থাকবে তার  সর্বোচ্চ মান বা ম্যাক্সিমাম (চিত্র ২)। আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে a এর মান শূন্য হতে পারবে না, কেননা সেক্ষত্রে সেটা আর দ্বিঘাত সমীকরণ থাকবে না, হবে রৈখিক সমীকরণ।

 


চিত্র - ১

                                                                        চিত্র - ২ 

 (১) নং সমীকরণ সমাধান করার জন্য আমরা সাধারণত যেটা করি তা হল এটাকে দুটো বর্গের পার্থক্য হিসেবে প্রকাশ করা। আর সেজন্য আমরা একে প্রথমে a দিয়ে ভাগ করি   


 

এখানে উল্লেখ্য যে (১) নং সমীকরণে x^2এর  কোয়েফিশনেন্ট ধনাত্মক বা ঋণাত্মক উভয়ই হতে পারে, আর () নং সমীকরণে তার মান 1, মানে ধনাত্মকএই প্রক্রিয়ায় মূলের বা পরাবৃত্তের সাথে x অক্ষের ছেদ বিন্দুর পরিবর্তন ঘটে না, যদিও এ ক্ষেত্রে x এর সাপেক্ষে y এর মান a গুণ কম হবে। কারণ (১) নং সমীকরণে x অক্ষের সাথে ছেদ করে যে পরাবৃত্ত সেটা হল

আর (২) নং সমীকরণে সেটা


যদি a এর মান ধনাত্মক হয়, [যেমন a = 2] তবে পরাবৃত্তের অরিয়েন্টেশন আগের মতই থাকবে (চিত্র ৩ ও চিত্র ৪) [b = 4, c = 4, আর a এর মান ঋণাত্মক হলে, [যেমন a = -2] x  অক্ষের সাপেক্ষে পরাবৃত্ত ১৮০ ডিগ্রী ঘুরবে মানে মিরর রিফ্লেকশন ঘটবে (চিত্র ৫ ও চিত্র ৬) [b = 4, c = 1] 


 

                                                                          চিত্র - ৩ 


                                                                           চিত্র - ৪ 



                                                                        চিত্র - ৫



                                                                  চিত্র - ৬ 


এরপর ফর্মুলা অনুযায়ী পাই

যেখান থেকে x এর দুটো মান পাই 


এখনও আমরা সেই পর্যায়ে কাজ করছি যখন x এর মান শুধু রিয়াল বা বাস্তব হতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে বর্গমূলের অভ্যন্তরে কখনোই ঋণাত্মক মান থাকতে পারে না। যদি D এর মান ঋণাত্মক, অর্থাৎ D < 0   হয় তবে পরাবৃত্ত  x অক্ষকে ছেদ করে না মানে (১) নং সমীকরণের কোন সমাধান নেই। অন্যভাবে বললে x এর কোন মানের জন্যই 

এর মান শূন্য হয় না, [যেমন a =1, b = 4, c = 6]  [চিত্র ৭]।


                                                               চিত্র - ৭ 


তবে D = 0  হলে

হবে পূর্ণ বর্গ। এক্ষেত্রে সমীকরণের দুটো মূল একই হবে আর পরাবৃত্ত x  অক্ষকে শুধু একটি বিন্দুতেই স্পর্শ করবে [চিত্র ৩ ও চিত্র ৪]। 

অন্য দিকে  D > 0  হলে মূল দুটো একে অন্যের থেকে ভিন্ন হবে। এক্ষেত্রে পরাবৃত্ত x  অক্ষকে দুটো ভিন্ন বিন্দুতে ছেদ করবে [চিত্র ৫ ও চিত্র ৬]।

(২) সমীকরণ দুটো পূর্ণ বর্গের পার্থক্য হিসেবে প্রকাশ না করে অন্য ভাবে প্রকাশ করা যায়। ধরা যাক এই সমীকরণের দুটো মূল p এবং q। তাহলে আমরা পাই 


যেখান থেকে আমরা পাই

 

এভাবে দ্বিঘাত সমীকরণের মান নির্ণয়ের পদ্ধতির আবিষ্কারক ফ্রান্সের গণিতবিদ ও সিম্বলিক বীজগণিতের প্রবর্তক ফ্রান্সুয়া ভিয়েট (Francois Viete, 1540 - 1603)

তাহলে নীচের ফর্মুলা ব্যবহার করে


(৬) ও (৭) থেকে আমরা p - q এর মান বের করতে পারি।  যেহেতু 


বর্গ সংখ্যা, এটা কোন ক্রমেই ঋণাত্মক হতে পারবে না। যদি সেটা ঋণাত্মক হয় তবে তবে সমীকরণের কোন সমাধান নেই, মানে এই পরাবৃত্ত কখনোই  x অক্ষকে ছেদ করে না। (৮) নং সমীকরণের রাইট হ্যাণ্ড সাইড ধনাত্মক হলে আমরা পাই 


 

(৬) ও (৯) নং সমীকরণের যোগফল থেকে আমরা p ও তাদের বিয়োগ ফল থেকে q এর মান পাই যা (৪) নম্বরের সাথে পুরাপুরি মিলে যায়। তবে এ সবই জানা কথা। সত্যি বলতে কী দ্বিঘাত সমীকরণে নতুন করে কিছু বলার নেই। সবাই সব জানে। তাহলে লিখছি কেন? বিভিন্ন ভাবে যে এই সমীকরণ সমাধান করা যায় আর সমীকরণ দেখে কিছু কিছু ব্যাপার প্রেডিক্ট করা যায় সেটা বলতে। যদি (৭) নং সমীকরণে রাইট হ্যাণ্ড সাইড ধনাত্মক হয় মানে যদি c/a > 0  তবে pq > 0 

এক্ষেত্রে p ও q উভয়েই হয় ধনাত্মক হবে নয়তো ঋণাত্মক হবে। অন্য দিকে (৬) নং সমীকরণ থেকে আমরা দেখি যদি b/a ঋণাত্মক হয় অর্থাৎ যদি b/a < 0 হয় তবে p + q  ধনাত্মক, মানে p ও q উভয়েই  হবে ধনাত্মক, অন্য দিকে b/a ধনাত্মক মানে b/a > 0 হলে p + q ঋণাত্মক, মানে p ও q উভয়েই হয় ঋণাত্মক।  

অন্য দিকে যদি (৭) নং সমীকরণে রাইট হ্যান্ড সাইড ঋণাত্মক হয়, মানে যদি c/a < 0  তবে pq < 0  

এক্ষেত্রে p ও q এর একটি হবে ধনাত্মক আর অন্যটি ঋণাত্মক। তাহলে (৬) নং সমীকরণ থেকে আমরা দেখি যদি b/a ঋণাত্মক হয় তবে p ও q এর মধ্যে যার মান বড় সেটি হবে ধনাত্মক, আর b/a ধনাত্মক হলে p ও q এর মধ্যে যার মান বড় সেটি হবে ঋণাত্মক। 

উদাহরণ হিসেবে নীচের সমীকরণগুলো দেখা যেতে পারে। 

এখানে a =1, b = 4, c = 6  সুতরাং 


তত্ত্ব অনুযায়ী এই সমীকরণের কোন মূল নেই। কিন্তু যদি

 

সেক্ষেত্রে  D  ধনাত্মক, সুতরাং 


(১৩) থেকে আমরা দেখি উভয় মূল হয় ধনাত্মক অথবা ঋণাত্মক। অন্য দিকে (১২) থেকে পাই উভয় মূল ধনাত্মক। (৯) নং সমীকরণ থেকে আমরা পাই 


 

(১২) ও (১৪) থেকে পাই p = 3, q = 2 

আরও যে কথাটা উল্লেখ করা দরকার তা হল b ও c এর মান। আগেই বলেছি যে a এর মান শূন্য হতে পারে না, তবে b  ও c এর ক্ষেত্রে এমন কোন সীমাবদ্ধতা নেই। যদি  b = 0  হয় তবে  x এর দুটো মান হবে


আর c = 0 হয় তবে x এর দুটো মান হবে

উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই সমীকরণের একটা মূল শূন্য হতে পারে শুধুমাত্র যদি c = 0 হয়

এভাবে যেকোনো সমীকরণ নিয়েই আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পারি। কথা হল এ থেকে কি আমরা নতুন কিছু শিখলাম? না। তাহলে? সমীকরণটা এভাবে সমাধান করে আমরা আসলে এটাকে যতটা না লেখাপড়া তার চেয়ে বেশি করে খেলায় পরিণত করলাম। আর পড়াশুনা যখন রুটিন মাফিক কাজের বাইরে আনন্দ বয়ে আনে, সেটা সমস্ত ব্যাপারটাকেই এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দেয়।  

দুবনা, ১০ মার্চ ২০২২ 

 

লেখাটি ভালোভাষা পত্রিকায়  ১১ মার্চ ২০২২ এ প্রকাশিত হয়েছে

https://bhalobhasa.com/interesting-math-facts-vietas-formula-for-quadratic-equations/




 

 


 

 




 

 


 

 

 


Comments

Popular posts from this blog

গবেষণা নিয়ে গবেষণা

গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে