গবেষণা নিয়ে গবেষণা
আমাকে বাংলায় বিজ্ঞান গবেষণা নিয়ে কিছু বলতে বলা
হয়েছে। আমি গবেষণা খুব বেশি একটা করি না, বাংলায় আরও কম। এইচএসসি পাশ করে ১৯৮৩ সালে
মস্কো আসি, তারপর আর ফেরা হয়নি। পড়াশুনা রুশ ভাষায়, কাজকর্ম সবই রুশ আর ইংলিশে। দেশে
যখন ছিলাম পদার্থবিদ্যার প্রতি আগ্রহ বশত টেলিস্কোপ, পেরিস্কোপ এসব তৈরি করা ছাড়া ক্লাসের
বাইরে কিছু করার অভিজ্ঞতা নেই। গ্রামে কারেন্ট না থাকায় স্কোপ ছিল সীমিত।
সতেন্দ্রনাথ বসুর কথায় যারা বলে বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা করা যায় না তারা হয় বাংলা জানেন
না, নয়তো বিজ্ঞান জানেন না। কথাটা সত্য আবার সত্য নয়ও। আমি ১৯৯৪ সাল থেকে গবেষণার সাথে
যুক্ত থাকলেও শুধু গত বছর তিনেক নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছি। এখন এখানে লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা
চালু হলেও আমি পরীক্ষা নেই সোভিয়েত স্টাইলে, মানে মৌখিক। ছাত্রছাত্রীদের বলা আছে, কী
লিখল সেটা মুখ্য নয়, কতটুকু বুঝল সেটাই নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করবে।
আমার বিশ্বাস কেউ যদি বিষয়টা ভালভাবে বোঝে সেটা সে ব্যাখ্যা করতে পারবে। ভাষাটা তো
নিজের মনোভাবকে, বোধটাকে সঠিক ভাবে প্রকাশ করার জন্যই। কিন্তু …
পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন শাখায় ট্রেস বলে একটা ধারণা আছে, এটা হল ডায়াগোনাল এলিমেন্টগুলোর সমষ্টি। রুশ বিজ্ঞানী সমাজে এ নিয়ে এক গল্প আছে। রুশ ভাষায় একে বলা হয় স্লেদ, জার্মান ভাষায় স্পুর। এদেশে স্পুর শব্দটাই বেশি প্রচলিত। একবার একজন যখন পেপার পড়ার সময় একে ট্রেস বললেন, অন্য একজন বিজ্ঞানী তাঁকে বললেন স্পুরের মত এতো সুন্দর রুশ শব্দ থাকতে ট্রেস বলার কী দরকার। হ্যাঁ, রুশ ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা হয়, খুব জোরেশোরেই হয়। তবে সব কিছুর রুশ প্রতিশব্দ করতেই হবে এ নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না।
আমি ছাত্রদের একটা কথা বলি। পুশকিন, রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়ার, গ্যেটে এরা নিজ নিজ ভাষার প্রধান কবি, লেখক। তাঁদের লেখায় ছন্দের, সৌন্দর্যের ঘাটতি নেই। কিন্তু যদি এসব ঠিক রেখে ব্যাকরণগত ভাবে ভুল লিখতেন, তাঁরা কি আজ এই অবস্থানে থাকতে পারতেন? একই ভাবে ফিজিক্সের ভাষা গণিত। যদি কোন গবেষণা গাণিতিক ভাবে শুদ্ধ না হয় সেটা কিন্তু সঠিক ভাবে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে পারবে না।
আসলে এই যে আমি কথা বলছি, সেটা তো শুধুই শব্দ। আপনারা বুঝছেন, কারণ আমাদের পূর্বপুরুষেরা একটা চুক্তি করেছেন যে এই শব্দ এটা বোঝাবে, ওই শব্দ ওটা। এদুয়ারদ উস্পেনস্কি নামে রুশ দেশে এক জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক ছিলেন। ক্রকডাইল গেনা ও তার বন্ধুরা বইয়ের শুরুতে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত কমলালেবুর বাক্সে এক অদ্ভুত জীবের আগমন ঘটে এ দেশে। কেউ জানেনা তার নাম। যেহেতু অনেকদিন বাক্সবন্দী থেকে সে হাঁটাচলা করতে প্রায় ভুলে গেছিল, তাই বাক্স খোলার সাথে সাথেই সে পড়ে যায়। তার নাম রাখা হয় চেবুরাশকা। আসলে এই যে আমরা কুকুরকে কুকুর, বাঘকে বাঘ বলি – এটা কিন্তু কুকুর বা বাঘ কেউ জানে না। এ সবই শর্তসাপেক্ষ। আমি যখন ক্লাসে ইলেক্ট্রোমাগ্নেটিজম পড়াই ম্যাগ্নেট সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলি ওর দুটো মেরু – উত্তর মেরু বা ধনাত্মক মেরু আর দক্ষিণ মেরু বা ঋণাত্মক মেরু। সাথে এটাও বলি যে এ নাম শর্তসাপেক্ষ বা কন্ডিশনাল। যেমন ধরুন আমাদের সব দেশে বিশ্বের মানচিত্রে উত্তর দিকটা উপরের দিকে, কিন্তু নিউজিল্যান্ডে দক্ষিণ দিকটা উপরের দিকে। হতেই তো পারত হিলবারট ইংলিশম্যান না হয়ে নিউজিল্যান্ডের হলে তিনি দক্ষিণ মেরুকে ধনাত্মক বলতেন।
আমার সত্যি বলতে কোন পেশা নেই, তবে নেশা আছে অনেক।
পদার্থবিদ্যা, ফটোগ্রাফি, বই পড়া, লেখালেখি করা ইত্যাদি। এসব করে আমি আনন্দ পাই, করার
আনন্দ থেকেই এসব করি। পদার্থবিদ্যায় কাজের জন্য বোনাস হিসেবে অবশ্য বেতন পাই। ফটোগ্রাফি
বা আর্টের ক্ষেত্রে একটা ধারণা আছে – মানুষ বাঁ দিকের উপরের কর্নার থেকে দেখতে শুরু
করে ধীরে ধীরে ডান দিকের নীচের কোণায় গিয়ে শেষ করে। তাই কোন ছবি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা
করতে গেলে এই ব্যাপারটা মাথায় রাখায় হয়। আমার মনে সব সময় প্রশ্ন জাগে এটা কি আমরা বাঁ
থেকে ডান দিকে পড়ি বলে? তাহলে আরব দেহসের লোকেরা যারা উল্টো দিকে মানে ডান থেকে বাঁদিকে
পড়ে আর ডাক দিকে উপরের কোণ থেকে শুরু করে বাঁ দিকের নীচের কোণে শেষ করে তাদের ছবি দেখার
স্বাভাবিক পদ্ধতি কী? অথবা চীন বা জাপানের মানুষের, যারা উপর থেকে নীচ দিকে পড়ে?
গত বছর আমি বাংলায় কসমোলজির উপর একটা বই লিখি। এ বিষয়ে অনেক দিন কাজ করছি। কমবেশি জানাও
আছে। কিন্তু বই লিখতে গিয়ে হল বিপদ। বাংলা শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যেহেতু গবেষণার
কাজে বাংলার সাথে যোগাযোগ নেই, তাই সমস্যা হল এসব শব্দের বাংলা আছে কিনা সেটা জানা
ছিল না। ১৯৮০ দশকের শেষে রাদুগা প্রকাশনীর একটা বই বাংলায় অনূদিত হয়েছিল। এটা ছিল পদার্থবিদ্যার
সমস্যা নিয়ে। করেছিলেন ডঃ শাহজাহান আলী। আমাকে বললেন একটা চ্যাপ্টার করে দিতে। এখানেও
সমস্যায় পড়েছিলাম টেরমিনলজি নিয়ে। এখন কথা হচ্ছে সেটা আমাদের কতটুকু দরকার? যেমন ধরুন
ব্ল্যাক হোল অথবা বর্তমানে বহুল আলোচিত ডার্ক এনার্জি। এদের বাংলায় কালো গহ্বর বা অন্ধকার
শক্তি (তাই কি?) বলা যায়। কিন্তু প্রতিটি শব্দের যেমন নিজস্ব অর্থ থাকে পদার্থবিদ্যার
(সব বিষয়েরই ) বিভিন্ন ধারণার নিজস্ব অর্থ থাকে। এটা কোন শদবের ওয়ান টু ওয়ান ম্যাপিং
নয়। ব্ল্যাক হোলের বাংলা কালো গহ্বর বলে আমরা যদি সেটা অন্ধকার বা কালো সাপের গর্ত
ভাবি বা ডার্ক এনার্জিকে অন্ধকার শক্তি (রুশে একে বলে তমনায়া এনারগিয়া – যার আক্ষরিক অর্থ
দাঁড়ায় অশুভ শক্তি) সেটা তো ঠিক হবে না। এই দুটো ধারণার নিজস্ব গাণিতিক সংজ্ঞা আছে।
আমার এসব বলার উদ্দেশ্য বাংলায় লিখি, ইংরেজিতে লিখি আর রুশে লিখি – ফিজিক্সের নিজস্ব
ভাষা আছে, নিজস্ব ভাষা আছে প্রতিটি বিষয়ের। কোন বিষয় ভালভাবে জানতে হলে তার সেই ভাষাটা
আয়ত্ব করতে হবে, মানে বুঝতে হবে। একবার বোধ আসলে ব্যাখ্যাও আসবে। তাই যেসব টেরমিনলজি
বহুল প্রচলিত সেগুলোর অনুবাদ না করলেও চলবে। আমরা চেয়ারকে যতই কেদারা বলিনা কেন, কেদারা
শব্দ শুনলে মানস চক্ষে আমরা চেয়ারটাই দেখি। বিদেশে ওয়াটার বা ভাদা বললেও চোখের সামনে
জল বা পানিই দেখি। ব্যাপারটা অনুধাবনের।
হতে পারে আমি খুব অলস বলে অভ্যেসের বাইরে যেতে চাইনা। দেশে সবাই চায় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে। আমি দেশে বুয়েটে পড়তাম যদি ফিজিক্সের প্রতি
বরাবর আগ্রহ। ভরতির কারণ ছিল ওই সময়ে বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট। তারপরেও
বুয়েটে ফিজিক্সের এক ক্লাসে টিচার একটা প্রশ্ন করায় উনি যখন বললেন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার
জন্য এটা না জানলেও চলবে আমি ওখানে পড়ব না বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই। সে বছরই মস্কো
যাই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। এয়ারপোর্টে নেমেই বলি সাবজেক্ট চেঞ্জের কথা। সবাই যেখানে
ফিজিক্স থেকে চেঞ্জ করে মেডিসিন বা ইঞ্জিনিয়ারিং –এ যায় আমার যাওয়া ছিল উল্টো স্রতে
সাঁতার কাটা। এখ কেউ জিজ্ঞেস ফিজিক্সে কেন পড়লাম করলে বলি
- আমি খুব অলস মানুষ। আমি যদি হাইও তুলি বা হাতও নাড়াই – ফিজিক্সে সেটা কাজ বলে প্রমাণ
করতে পারব, যদিও অনেকের মতে সেটা অকাজ। ফিজিক্স পড়ুন, ফিজিক্স বুঝুন, ফিজিক্স ভালবাসুন,
গবেষণা করে আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করুন। ফিজিক্স বিশেষ করে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যা – এটা
পেশা নয়, নেশা, মিশন। ভালো থাকবেন।
দুবনা, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
লেখাটি হৃদবাংলা (বিশ্ব বাংলা সাহিত্য সমাবেশ ২০২০ এর স্মারক সঙ্কলন) এ প্রকাশিত হয়েছিল। পৃষ্ঠা ৪২৬ - ৪৩১

Comments
Post a Comment