সত্যের সন্ধানে

 

বিকেলের সূর্যটা গাছের ডালে আটকে থাকতে থাকতে একসময় অদৃশ্য হয়ে গেছে। সন্ধ্যা নামি নামি করেও যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে কিসের অপেক্ষায়। ননীদি হ্যারিকেন মুছছে। ননীদি বাড়ির অনেক কাজের লোকের একজন। প্রায়ই আমাদের বাড়িতেই থেকে যায়। থাকলে ঘরে ঘরে হ্যারিকেন ওই পৌঁছে দেয়।
- ননীদি বাতি লাগাতে আর কতদূর।
- এই তো বউদি সন্ধ্যা প্রদীপ দেখালেই বাতি জ্বলবে।
উচ্চ বিত্ত হিন্দু বাড়ির ঝামেলার শেষ নেই। বাড়িতে তখন গোটা কুড়ি ঘর। সব ঘরের সামনে ধুপ আর সন্ধ্যা প্রদীপ দেখানো শেষ না হলে বাতি জ্বলবে না। এটা ধর্মীয় আচার নাকি কুসংস্কার নাকি ট্র্যাডিশন কে জানে। ছোটবেলায় মনে হত ধর্মীয় আঁচার, পরে কুসংস্কার। কিন্তু সকালে যখন বিছানায় শুয়ে চায়ের অপেক্ষা করতাম মা বলতেন
- চা হয়ে গেছে, উঠে হাতমুখ ধুয়ে নে। চা কি বারান্দায় দেব নাকি বেড টি খাবি?
সকালে বা সন্ধ্যায় চা না খেলে জীবনটাই বৃথা হয়ে যেত, কিন্তু এটাকে তখন কুসংস্কার বলে মনে হয়নি, বরং ছিল ট্র্যাডিশন। কেন? অনেক কিছুই আমরা এভাবে ভাবতে অভ্যস্ত
সময়ের সাথে সাথে অনেক কুসংস্কারের জন্য মন খারাপ করে। এখন দেশে গেলে দিদি বা বউদি যখন ঘরে বাতি দেখিয়ে বা তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে  সুইচ অন করে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালায় সেটা দেখতে বরং ভালই লাগে, কিছুক্ষণের জন্য হলেও ছোটবেলায় ফিরে যাওয়া যায়।

আমাদের শৈশব কেটেছে রামায়ণ, মহাভারতের গল্প শুনে শুনে আর সেভাবেই গড়ে উঠেছে ভাল মন্দের ধারণা। রাম
আর পাণ্ডবদের বীরত্বে শিহরিত হয়েছি, তাদের জয় কামনা করেছি। কেন? সেটাও মনে হয় বড়দের দেখে দেখে। যদিও রামায়ণেই ইন্দ্রজিৎ তাঁর খুড়ো বিভীষণকে ভর্ৎসনা করেছিলেন তবুও তাঁকে কখনোই বিশ্বাসঘাতক বলে মনে হয়নি। এমনকি মধুসূদন দত্তের “মেঘনাদ বধ” পড়েও বিভীষণ কখনোই মীরজাফরের মত ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠেনি। কারণ? মনে হয় রাবণ সীতাকে হরণ করেছিলেন বলেই রামের পক্ষে আমাদের এই পক্ষপাতিত্ব, ঠিক যেমনটি হেক্টরের বীরত্বের পরেও একিলিসের পক্ষ নিয়েছি প্যারিস হেলেনকে চুরি করায়। ভাবিনি কী মেঘনাদ, কী হেক্টর – এরা মাতৃভূমির জন্য লড়াই করছে, মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে। তবে সময় বদলে গেছে। বদলে গেছে আমাদের ভাবনার জগত। এমনকি দেবতাও যদি অন্যায় করে আমরা প্রশ্ন করি। হ্যাঁ, আমরা এখন  প্রশ্ন করতে শিখেছি। তাই রাম সীতাকে বনবাসে পাঠিয়ে ভুল করেছিলেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হয়। হয়তো বর্তমানে রাজনীতিতে রামের উপস্থিতি তাঁকে দেবতার আসন থেকে মানুষের মধ্যে নিয়ে এসেছে। আর তাই আমরা রামের অস্তিত্ব নিয়ে, তাঁর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করি, প্রশ্ন করি তাঁর প্রজা বাৎসল্য নিয়ে, নারীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
ছোটবেলায় বিভিন্ন লোকের মুখেই শুনেছি ঈশ্বরই সত্য, সত্যই ঈশ্বর। সত্যের সন্ধান মানেই ঈশ্বরের সন্ধান। বিবেকানন্দের ভাষায়

তুমি কে কেন জন্ম কিসে বা কল্যাণ
এইরূপ প্রশ্ন করি লভ তত্ত্ব জ্ঞান
সে জ্ঞান লভিলে তব মোহ কেটে যাবে
তুমি আমি জীব জগতে পার্থক্য না রবে

সেই সময় মনে হত যেহেতু বিজ্ঞানী সত্য সন্ধানী তাই বিজ্ঞান চর্চা করলেই ঈশ্বরের সেবা হয়। তাই অনেক দিন পর্যন্ত ঈশ্বর নিয়ে ভাবার কোন প্রয়োজন বোধ করিনি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে যায়। ধীরে ধীরে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের সাথে পরিচয় ঘটে। বিশ্বাস করি ঈশ্বরের অসারত্বে, সন্দেহ করি তাঁর অস্তিত্বের সত্যতায়। তবে একটা সময় আসে যখন ভাবনা অন্যদিকে মোড় নেয়। না, ব্যাপারটা এমন নয় যে ঈশ্বরে বিশ্বাস ফিরে পাই। তবে এটা বুঝতে পারি বিশ্বাসের মতই অবিশ্বাসও একটা বিশ্বাস। বিশ্বাসীরা যেমন অন্ধভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে অবিশ্বাসীরা তেমনি অন্ধভাবে তাঁকে অবিশ্বাস করে। যেহেতু দু' দলই দুটো সমান্তরাল বাস্তবতায় বাস করে তাদের মধ্যে যুক্তি কাজ করে না। তাহলে? আমার গবেষণা কসমোলজির উপর। মহাবিশ্বের উৎস, তার বিবর্তন, গঠন, পরিণতি – এসবই কসমোলজির বিষয়। আচ্ছা, একজন লোক যখন অসুস্থ হয় তার জন্য কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ – ওষুধের আবিষ্কারক কে সেটা জানা নাকি কীভাবে এই ওষুধ ব্যবহার করা হয় সেটা জানা?  তাই ঈশ্বর আছে কি নেই সেই বিতর্কে না গিয়ে প্রকৃতির রহস্য জানা চেষ্টা করাটাই কী বুদ্ধিমানের কাজ নয়? আর প্রকৃতির রহস্য অনুসন্ধানই তো সত্যের অন্বেষণ।

এখন প্রশ্ন হল বিজ্ঞানী যে সত্যের সন্ধান করে তার রূপ কেমন? একজন সত্যান্বেষী হিসেবে তার উচিৎ কি শুধু নির্ভেজাল সত্য খোঁজা নাকি সে সেই সত্য খুঁজবে যেটা তার উপকারে না এলেও অপকার করবে না? আর তাই যদি হয় সে কি তখনও সত্যান্বেষী থাকবে, নাকি স্বার্থান্বেষী হবে? গবেষকদের প্রায়ই সে যে বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে সেটার প্রাসঙ্গিকতা, সম্ভাব্যতা, প্রয়োগ ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় এর মানে হচ্ছে চাক বা নাই চাক, বিজ্ঞানীকে ভাবতে হয় তার কাজ কারও উপকারে আসবে কিনা। অর্থাৎ সত্যের নয় সে বাধ্য হয় স্বার্থের খোঁজ করতেহোক সেটা নিজের, অন্যের বা সমাজের স্বার্থ।

আচ্ছা কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিও যখন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে বললেন, তারা কি কোন স্বার্থের কথা ভেবেছেন? পৃথিবী সূর্যের চারদিকে নাকি সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছেএটা কি সরাসরি কোন মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে? বরং এই সত্য তাদের ব্যক্তি জীবনে অনেক কষ্ট এনেছে। তবুও তাঁরা এটা করেছেন শুধুই সত্যকে জানার জন্য, ভাল মন্দের কথা না ভেবে। আর এই সত্য পরবর্তীতে মানুষকে সাহায্য করেছে আরও বড় রহস্য উদ্ঘাটনে এই যে স্বার্থের কথা না ভেবে সত্য সন্ধান করা, সত্য সন্ধানে প্রয়োজনে অপ্রিয় প্রশ্ন করাসেটাই বিজ্ঞানমনস্কতা।

বর্তমান জগতের একটা বড় সমস্যা হল বিজ্ঞান এগিয়ে গেলেও মানুষ এগোয়নি, বিজ্ঞান মানুষের জীবনের অনেক বাহ্যিক চাহিদা মেটালেও, তার বিশ্বকে সুদূর প্রসারী করলেও মানুষের অন্তরকে সেই বিশালতা  দান করতে পারেনি। বিজ্ঞান মানুষকে বিজ্ঞানভোগী করেছে, বিজ্ঞানমনস্ক করেনি। আর এই কথাটা অধিকাংশ মানুষের জন্যই সত্য। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ফল ভোগ করেছে মূলত বৃহৎ পুঁজি। সাধারণ মানুষ যে কিছুই পাচ্ছে না সেটা ঠিক নয়, তবে এই বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই দেশে দেশে এসেছে উপনিবেশিয় শাসন। আজ যে পৃথিবী মারাত্মক সব অস্ত্র সজ্জিত সেটাও বিজ্ঞানের কাঁধে ভর করেই। আবার যারা বিজ্ঞানকে স্বীকারই করে না সেই মৌলবাদী শক্তিও বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে পুঁজি করেই চালিয়ে যাচ্ছে তাদের হিংসাত্মক ধ্বংসাত্মক কাজকর্ম। আমরা যারা নিজেদের আলোকিত মানুষ বলে মনে করি তারাও পিছিয়ে নেই যদিও সেটা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেরা অনুধাবন করতে পারি না। প্রায়ই বৃহৎ পুঁজির প্রোপ্যাগান্ডায় অন্ধের মত তাদের অনুসরণ করি। ক্ষেত্রে  কম্পিউটার ২০০০ সালকে ১৯০০ মনে করে বিশাল বিপর্যয় ঘটাতে পারে সেই ক্যাম্পেইনের করা উল্লেখ করা যেতে পারে।

আসলে আমরা নিজেদের সার্বিকভাবে বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তুলতে পারিনি বলেই বিজ্ঞানে প্রতিনিয়ত এগিয়ে গিয়েও মানুষের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি। উল্টা বলা যায় আমরা প্রতিনিয়ত পিছিয়ে যাচ্ছি, প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে নানান রকম দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছি। আমার বিশ্বাস এখন যদি পরিবেশ নিয়ে কথা বলি সবাই হাত তুলে সায় জানাবে, অথচ কোন কথা আমাদের লিবারেল চিন্তার বিপক্ষে গেলেই সবাই রা রা করে উঠবে। ইদানীং কালে হিড়িক পড়েছে নারী পুরুষের সমান অধিকারের নামে বাবা মার পরিবর্তে প্যারেন্ট ১ আর প্যারেন্ট ২ বলার। কিন্তু প্রশ্ন হল কাউকে তো ১ বা ২ হতে হবে। এক ফ্যামিলিতে বাবা ১ আরেক ফ্যামিলিতে মা ১ হলে তো সমস্যা। আসলে এটা তো অধিকারের প্রশ্ন নয়, ভাষার প্রশ্ন। আমরা যাতে একে অন্যকে বুঝতে পারি তাই ভাষার আবিষ্কার। আমরা গরুকে গরু আর ভেড়াকে ভেড়া বলি কাউকে ছোট বা বড় করার জন্য নয়। আবার ইদানীং শুনি অনেক দেশেই আইন করা হচ্ছে শিশুই ঠিক করবে সে ছেলে না মেয়ে। কিন্তু আমাদের কাছে জিজ্ঞেস না করে প্রকৃতি অনেক আগেই সেটা ঠিক করেছে। পরিবেশ দূষণ যেমন প্রকৃতি বিরোধী, আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ, আমাদের নিজেদের ঠিক করা কে ছেলে আর কে মেয়ে – সেটাও কি একই রকম প্রকৃতির না হলেও আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ নয়? পৃথিবী বা প্রকৃতি আমাদের ছাড়াও টিকে ছিল, টিকে থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক ফ্যাশনের শিকার হয়ে আমরা এ ব্যাপারে মুখ খুলব না। আমরা রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে সত্যকে বলি দেব। আর সত্যকেই যদি বলি দেই আমরা তাহলে বিজ্ঞানমনস্ক থাকব কীভাবে? কীভাবে নিজেদের প্রগতির ধারক বাহক বলব?   

সত্যই যদি ঈশ্বর হন আর সত্যের সন্ধানই যদি বিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্য হয় তাহলে ধর্ম আর বিজ্ঞানে এত শত্রুতা কেন? এই দু জনার পথ এত ভিন্ন কেন? ধর্ম যদিও ঈশ্বরকে সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বভূতে বিদ্যমান মনে করে তবুও কি এক অজ্ঞাত কারণে ধার্মিকরা তাঁকে কেউ মন্দিরে, কেউ মসজিদে, কেউ গির্জা বা অন্য কোন উপাসনালয়ে বন্দী করে রাখতে চায়। মানে ধর্ম তথা ধার্মিক স্বার্থান্বেষী। অন্যদিকে বিজ্ঞান তার আবিষ্কৃত সত্যকে সকলের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চায় আর তাই সে সত্যিকার সত্যান্বেষী। আর সব চাইতে বড় কথা বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই, ধর্মে আছে। আর ধর্মে শেষ কথা আছে বলেই সে পশ্চাৎগামী। সে ফিরে যেতে চায় তার রাম রাজ্যে, মদিনা সনদে বা অন্য কোথাও। কিন্তু বিজ্ঞান সম্মুখগামী। সে অনবরত প্রশ্ন করে, জানতে চায়। তার জানার শেষ নেই, শেষ নেই তার জানার আগ্রহের। সবচেয়ে বড় কথা সে জানে প্রতিটি নতুন তথ্য তার সামনে অসংখ্য অজানা তথ্যের দ্বার উন্মুক্ত করবে। তার এই চলা অন্তহীন। 

তবে এই দোষে কি শুধু ধার্মিকরাই দোষী? মোটেই না। আসলে ধর্ম মানে শুধু প্রথাগত ধর্ম বিশ্বাস নয়। যেকোনো বিষয়ে, এমনকি বিজ্ঞানে অন্ধবিশ্বাসও বিজ্ঞানকে ব্যক্তির জন্য ধর্মে পরিণত করে। মনে পড়ে আশির দশকের  সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা যখন গরবাচেভ প্রায়ই লেনিনের কাছে ফিরে যাবার কথা বলতেন। কিন্তু সত্যিকার বিজ্ঞানে অন্ধবিশ্বাসের স্থান নেই। এখানে সব কিছুই গ্রহণ করতে হয় প্রশ্নের কষ্টিপাথরে যাচাই করে। আমরা যখনই কোন বিষয়ে, তা সে ধর্ম হোক, বিজ্ঞান হোক, রাজনীতি হোক, সামাজিক রীতিনীতি হোক, প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকি, অন্ধভাবে গ্রহণ করি তখন আমরা বিজ্ঞান থেকে, বিজ্ঞানমনস্কতা থেকে দূরে সরে আসি। এটা যে সব সময় ক্ষতিকর তা নয়, তবে কোন কিছু যাচাই করে না নিলে ঠকার সম্ভাবনা বেশি।   

আমাদের মনে রাখতে হবে একজন বিজ্ঞানীর তার পেশাগত জীবনে যেমন বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া দরকার, তেমনি সেটা দরকার পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনেও। ধরুন একজন প্রগতিশীল মানুষ মিটিং মিছিলে নারী অধিকারের কথা বলে বেড়ায় অথচ নিজের বাড়িতে নারীর প্রাপ্য সম্মান দেয় না, তাকে কি প্রগতিশীল বলা যায়? একইভাবে একজন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রগতিশীল আদর্শের আলো বয়ে বেড়ায় অথচ যখন রাজনীতির প্রশ্ন আসে তখন অন্ধভাবে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে, আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কে সমর্থন করে। তাকে কি আমরা বিজ্ঞানমনস্ক বলব? সে যে কাউকে সমর্থন করতেই পারে, যে কাউকে ভোট দিতেই পারে, এটা তার নাগরিক অধিকার। কিন্তু যে মুহূর্তে সে নিজের প্রার্থীর দুর্বলতা বা প্রতিপক্ষের সবলতা অন্ধভাবে এড়িয়ে যায় সে তখন আর সত্য সন্ধানী থাকে না, স্বার্থান্বেষী হয়। হতেই পারে নির্বাচন একটা ক্রিটিক্যাল ব্যাপার, এখানে হারজিতের প্রশ্ন আসে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও যখন মানুষ এভাবেই চলতে বা বলতে থাকে সেটাকে কী বলা যায়? একই ভাবে এটা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখন আমরা প্রায়ই তালিবান, আল কায়েদা, আইএসএস সবের সমালোচনা করি। তবে সেটা করার সাথে সাথে আমাদের মনে রাখতে হবে এর মূলে রয়েছে সভ্য দেশগুলোর পরস্পরের বৈরিতা, যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণ, নিজেদের স্বার্থ কায়েম করতে আমেরিকার তালিবান, আল কায়েদা, আই এস এস ইতাদি গঠন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের শুধু আধুনিক সভ্যতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এসবই উপহার দেয়নি, সারা বিশ্বের মানুষের জন্য অনেক দুঃখ কষ্টও নিয়ে এসেছে। বিজ্ঞানের মূল কথা সত্য সন্ধান, সমস্যার সার্বিক সমাধান। বর্তমান বিশ্বে আমরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি  তার সমাধানের জন্য আমাদের বিভিন্ন সভ্যতার, বিভিন্ন জাতির গৌরবময় অতীতের সাথে সাথে তাদের রক্তাক্ত কলঙ্কময় ইতিহাসও স্মরণ করা দরকার। শুধুমাত্র সবকিছুর নিরপেক্ষ কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টিগেশন আমাদের পরম সত্যে পৌঁছে দিতে পারবে।

সত্য কোন ফ্যাশন মেনে চলে না, তার কোন ফ্যাশনের দরকার নেই। কিন্তু আজকাল আমরা প্রায় সবাই ফ্যাশনের পেছনে ছুটি। এখন সারা বিশ্বে নতুন ফ্যাশনবিএলএম। এমনকি ফুটবলের মাঠেও।  অবশ্য শুধু তারাই নয়, দেশে দেশে নির্যাতিত সব মানুষই তাদের দুর্ভাগ্যের হিস্যা চাইতেই পারে উপনিবেশবাদী শক্তির কাছে। যাদের পূর্বসূরিরা দাস হিসেবে আমেরিকা গড়ে তুলেছে শুধু তারাই নয়, যাদের পূর্বসূরিরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে পশ্চিমা বিশ্বকে উন্নতির চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে তারাও হিস্যা চাইতেই পারে। কিন্তু কথাটা হল আজকে আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি সেটা সবারই সম্মিলিত চেষ্টার ফসল। পুঁজি আর শ্রমের সম্মিলনে যে সারপ্লাস ভ্যালু গড়ে ওঠে সেখানে যেন আমরা পুঁজির ভুমিকাকেও অবজ্ঞা না করি। আসলে আমার মনে হয় সত্য হল জীবন। জীবনের কোন রং নেই বা বলা যায় সব জীবনের রঙই এক, যেমনটা রক্তের। তাই সত্যান্বেষী যেকোনো মানুষের মূল শ্লোগান হওয়া উচিৎ

«শোনরে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই» 

 

আচ্ছা, পৃথিবীর সবকিছুর মতই সত্যও কি আপেক্ষিক? এর উত্তর হ্যাঁ এবং না দুটোই। সত্য এক, তবে এর ইন্টারপ্রিটেশন ভিন্ন। সেটা দেশে দেশে, যুগে যুগে বদলায়। একজন লোক যখন মারা যায় মৃত্যুটা চরম সত্য। তবে কীভাবে মরল, মানে মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে বিভিন্ন সমাজে, বিভিন্ন সময়ে এই মৃত্যুর বিভিন্ন ইন্টারপ্রিটেশন হতে পারে। কারণ মৃত্যুটা প্রাকৃতিক নিয়ম, এর ইন্টারপ্রিটেশন সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়। আমরা জানি পদার্থবিদ্যার সুত্রগুলো ইউনিভার্সাল, কিন্তু তারপরেও তাদের ইমপ্লিমেন্টেশন হয় লোকালি। ইনিশিয়াল বাউন্ডারি ভ্যালুর উপর নির্ভর করে একই সূত্র বিভিন্ন সমাধান দিতে পারে। তাই যখন আমরা দেশ, কাল, পাত্র, সমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিবেচনায় না এনে কোথাও ভিন্ন দেশের সফল মডেল আরোপ করতে চাই সেটা অনেক ক্ষেত্রেই বিপর্যয় ডেকে আনে। একজন বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হয়তো তার ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে এটা রোধ করতে পারবে না, তবে নিরপেক্ষভাবে সত্যের কথা বলে, সত্য প্রচার করে সে মানুষকে সত্যান্বেষী করে তুলতে পারবে, বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে পারবে, সামাজিক বা গণমাধ্যমে প্রচারিত বিকৃত সত্য সম্পর্কে মানুষকে সাবধান করতে পারবে, কারণ এসব মাধ্যম মানবতার নামে মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থে কথা বলে, মানবজাতির জন্যে নয়। আসুন সত্যের পাশে দাড়াই।


লেখাটি হৃদবাংলা ২০২১ এর ছাপা হয়েছে। পৃষ্ঠা ৩৭৪ - ৩৭৯

 

https://ia601405.us.archive.org/9/items/hridbangla-2021/%E0%A6%B9%E0%A7%83%E0%A6%A6%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%20%E0%A7%A8%E0%A7%A6%E0%A7%A8%E0%A7%A7.pdf

 



Comments

Popular posts from this blog

মজার অংক, অংকের মজা

গবেষণা নিয়ে গবেষণা

গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে